লেখকঃ কাজী গণিউর রহমান
অনাবশ্যক ঝুঁকি কমাতে ও আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবিবি) ৯টি দুর্বল নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন (NBFI) তরলীকরণ (liquidation) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, গুরুতর অসম্পাদিত ও অনিষ্পত্তিকৃত দেনা নিয়ে থাকা এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা করা জরুরি হওয়ায় সরকারি সম্মতিতে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছে।
সিদ্ধান্তের সারমর্ম ও সময়সীমা
বিবিবি জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত ৯টি প্রতিষ্ঠান — FAS Finance, Bangladesh Industrial Finance Company (BIFC), Premier Leasing, Fareast Finance, GSP Finance, Prime Finance, Aviva Finance, People’s Leasing ও International Leasing — আগামী কিছু মাসের মধ্যে তরলীকরণ প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে। গভর্নর মনে করিয়েছেন যে এই পদক্ষেপ চলতি বছরের মধ্যেই শেষ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে; তরলীকরণ শেষে ঋণ আদায় ও সম্পদ বিক্রয় জারি থাকবে। বরাদ্দকৃত আমানতকারীর দাবিদাওয়া মেটাতে সরকার অর্থায়ন করবে—তবে তাৎক্ষণিকভাবে কত টাকা বরাদ্দ করা হবে, তা চূড়ান্ত হয়নি।
কেন এই কঠোর অবস্থান নেওয়া হলো?
বিবিবির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, আর্থিক খাতের ডিফল্টড ঋণের পরিমাণ চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিল Tk 250.89 কোটি (উল্লেখ্য: সংবাদায়ন সূত্রভিত্তিক)। এই মোট খারাপ ঋণের অর্ধেকের বেশি-ই বর্তমানে ওই ৯টি NBFI-র দায়বদ্ধতার মধ্যে আছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। গুরুতর খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি-মূলক কার্যকলাপ ও ব্যবস্থাপনার অনিয়ম—এসব মিশ্র কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কাঠামো আগেই ভেঙে পড়েছে।
NBFI খাতে পুরনো সংকটের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের NBFI সেক্টর দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল সম্পদের মান, অধিক খেলাপি ঋণ এবং কিছু ক্ষেত্রে কেলেঙ্কারি-প্রবণতার কারণে চাপের মুখে পড়েছে। ২০১৮–২০২২ সালের সময়কালে প্রখ্যাত কেলেঙ্কারির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল প্রাশান্ত কুমার হালদারের (PK Halder) প্রতারণা—যার ফলে কয়েকটি লিজিং কোম্পানি ও ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান বড় অংকের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বহু প্রতিষ্ঠান আইনি জটিলতা ও শুল্ক-সংক্রান্ত কারণে আর্থিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে; এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর সেভাবে অভ্যন্তরীণ অবস্থা মূল্যায়ন করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।
প্রভাব ও প্রত্যাশিত ব্যয়-ভার
তরলীকরণ প্রক্রিয়া এবং আমানত পরিশোধে সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ কী হবে — এ বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষক বলেন এটি বড় অর্থনৈতিক দায়িত্ব। The Business Standard ও The Business Standard-সহ অন্যান্য গণমাধ্যম আগে অনুমান করেছিল যে NBFI-গুলোর ব্যাপক তরলীকরণ করলে সরকারের খরচ কমপক্ষে Tk ১০,০০০–১২,০০০ কোটি পর্যন্ত হতে পারে। তবে সঠিক ব্যয় সরকারি সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে নির্ভরশীল। তরলীকরণ শেষে সম্পদ বিক্রি ও ঋণ আদায়ে কতটা ফেরত আসে—তাতেই চূড়ান্ত ট্যাক্সপেয়ারের বোঝা নির্ভর করবে।
নিয়োগনীতি ও বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠান
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে থেকেই ২০টি দুর্বল NBFI-কে চিহ্নিত করেছিল। এবার ৯টি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেও বাকী ১১টি প্রতিষ্ঠানকে তাদের ব্যালান্সশিট শক্তিশালী করতে বলা হয়েছে; তৎপর না হলে তাদেরও একই পথে নিয়ে যাওয়া হবে। অর্থাৎ এই উদ্যোগ কেবল নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়—সম্পূর্ণ সেক্টরের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে একটি সংকটমুক্তিকরণ প্রক্রিয়ার অংশ।
যা হবে আমানতকারীদের সঙ্গে
বিবিবি জানিয়েছে, সরকার আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে তহবিল প্রদানে সহায়তা করবে। গভর্নর আহসান মনসুর জোর দিয়ে বলেছেন—“আমাদের লক্ষ্য হলো আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষিত রাখা; এজন্য দ্রুত ও আইনগতভাবে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হবে।” (উক্তির পরিভাষ্য: সংক্ষেপে)। তরলীকরণ প্রক্রিয়া চলাকালে আমানতকারীদের চাহিদা ও ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া কীভাবে চলবে—তার বিস্তারিত নির্দেশিকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করবে।
চ্যালেঞ্জ ও পরবর্তী ধাপ
তরলীকরণ শেষ হলেও সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পুনরুদ্ধার করা সময়সাপেক্ষ হবে। আদালতীয় ও আইনি জটিলতা, সম্পদের মূল্যায়ন, পাওনাদারদের দাবিদাওয়া—এসব মিলিয়ে প্রকৃত আংশিক পুনরুদ্ধার দেখাতে বছর সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি, সেক্টরের বিশ্বাস পুনর্গঠন, মানসম্মত নীতি প্রয়োগ ও তদারকি জোরদার করাই প্রধান কাজ হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি পুনরায় সৃষ্টি না হয়।
প্রাসঙ্গিক তথ্যচিত্র
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১। কেন ৯টি NBFI-ই বন্ধ করা হচ্ছে?
উত্তরঃ কন্ঠস্বরে ভগ্ন দেনা ও ব্যালান্সশিট দুর্বলতার কারণে—এগুলো যাতে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ না হয়, তাই তরলীকরণ করা হচ্ছে।
প্রশ্ন ২। আমানতকারীরা কীভাবে ক্ষতিপূরণ পাবে?
উত্তরঃ সরকারী তহবিল ব্যবহার করে আমানতকারীদের দাবিসমূহ নিষ্পত্তি করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে; পরিশোধের সরাসরি প্রক্রিয়া ও সময়সীমা পরে জানা যাবে।
প্রশ্ন ৩। সরকারকে এ সিদ্ধান্তে কত ব্যয় হবে?
উত্তরঃ বিভিন্ন বিশ্লেষক আন্দাজ করছেন তরলীকরণ ও ক্ষতিপূরণে সরকারি ব্যয় Tk ১০,০০০–১২,০০০ কোটি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে; তবে চূড়ান্ত হিসাব প্রক্রিয়া শেষে নির্ধারিত হবে।
প্রশ্ন ৪। বাকি ১১টি NBFI-এর ভবিষ্যৎ কী?
উত্তরঃ তাদের ব্যালান্সশিট শক্তিশালী না করলে বা ব্যবস্থাপনা উন্নত না করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।
আরো পড়ুনঃ
ভারতীয় পণ্যে মার্কিন ৫০% শুল্ক কার্যকর, বাড়ছে বাণিজ্যিক অস্থিরতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের লাভের রেকর্ড—এক বছরে নেট প্রফিট বেড়ে ২২,৬০০ কোটি টাকা
তথ্যসূত্র
- bdnews24.com – “BB to shut nine troubled financial institutions”.
The Financial Express –“BB working to liquidate 9 NBFIs by 2025”.




