লেখকঃ কাজী গণিউর রহমান
প্রায় বিশ মাস আগে কক্সবাজার রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনের পরও সেখানে এখনও কার্গো (ভারি পণ্য) পরিবহন শুরু হয়নি। অথচ এই রেললাইনকে কেন্দ্র করে মহানগর ও কৃষিপণ্য পরিবহনের মাধ্যমে একটি আধুনিক লজিস্টিক হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্বের কারণে সেই লক্ষ্য এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। এর ফলে শুধু রেলের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কাই নয়, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
পরিকল্পনা ও বাস্তবতা
দোহাজারি-চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০২ কিমি রেললাইনটি (প্রকল্প ব্যয় আনুমানিক ১১,০০০ কোটি টাকা) ২০২৩ সালের শেষভাগে চালু করা হয়। ওই রুট চালু করার সময় আশা করা হয়েছিল, এটি পর্যটনকে সহায়তা করবে এবং আশেপাশের মাছ, লবণ, পান, পটা ও কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন মালামাল সাশ্রয়ী মূল্যে রেলযোগে সরবরাহ করা যাবে—সেই সঙ্গে বার্ষিক আর্থিক লাভের পূর্বাভাসও ছিল।
কিন্তু বাস্তবে প্রথম বছরে ওই রুট থেকে আয় হয়েছে মাত্র ৮০ কোটি টাকা —এটি শুরুতেই প্রত্যাশিত প্যাসেঞ্জার-রাজস্বের এক-পঞ্চম অংশও হয় নি। রেল কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাস ছিল—লাইন থেকে বার্ষিক ৪৪২ কোটি টাকা রিটার্ন পাওয়া যাবে, যেখানে ৫০ কোটি টাকা ফ্রেইট থেকেই আসার কথা ছিল। দেখা গেল কার্গো না থাকায় সেই চিহ্নিত আয় হালকা অবিকলই অনুপস্থিত।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের ক্ষোভ — সড়কে চাপ, বাজে অবস্থা এভাবেই চলবে?
শিল্পী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ট্রেডাররা বলছেন, কার্গো ট্রেন না থাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫,০০০টি গাড়ি কক্সবাজার-চট্টগ্রাম কাঁচা সড়ক দিয়ে চলাচল করছে; ফলস্বরূপ রাস্তায় চাপ বেড়ে চলছে, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে—বিশেষত লবণের ট্রাকের কারণে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে পড়া একটি বড় সমস্যা। অনেকেই মনে করেন, কার্গো সেবা চালু হলে সড়কে চাপ অনেকটা কমবে এবং পণ্য পরিবহন খরচও হ্রাস পাবে।
অবকাঠামো ও অপারেশনাল বাধা — কেন শুরু না হলো কার্গো?
বিশেষজ্ঞ ও রেল সূত্র বলছেন কয়েকটি কারণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—প্রয়োজনীয় লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, কার্গো টার্মিনাল ও লোডিং-আনলোডিং সুবিধা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত নয়, সঙ্গতিকে প্রয়োজনীয় রানিং ওয়াগন ও লণ্ডারিং-পরিকাঠামোর ঘাটতিও রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও অর্থনৈতিক যুক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ না হওয়ার ভূমিকা থেকেও সময়ক্ষেপ হয়েছে—কয়েকটি প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সমালোচনাও উঠেছে।
টেকসই লজিস্টিক হাব হওয়ার সম্ভাবনা
রেললাইনটি দীর্ঘমেয়াদে কক্সবাজারকে কেবল পর্যটনকেন্দ্রই না—বরং দক্ষিণ অঞ্চলের একটি লজিস্টিক নোডে পরিণত করার সক্ষমতা রাখে। তবে কাজটি করতে হলে—কার্গো-টার্মিনাল দ্রুত স্থাপন, লগিস্টিক পার্টনারশিপ উৎসাহ, পণ্য-বেষ্টিত ট্রেনের ধারা এবং মালবাহী ভ্যাগন বা লাজার-ভ্যান সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় ব্যাবসায়ীরা ও রেল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও ব্যবসায়িক মডেল দ্রুত চূড়ান্ত করা হলে রুটের সম্ভাবনা কাজে নামানো সম্ভব।
তথ্যচিত্র (সংক্ষিপ্ত তুলনা)
চূড়ান্ত বিশ্লেষণ
কক্সবাজার রেললাইনটি যাত্রী সেবায় স্বল্পকালীন সফলতা দেখালেও, মালবাহী সেবার অনুপস্থিতি এটিকে লজিস্টিক-হাব হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নকে ব্যাহত করেছে। প্রকল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়েছে—এবং রুটটি উন্নয়ন-গুণে সক্ষম—তবে তা থেকে পূর্ণ সুবিধা পেতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি: কার্গো টার্মিনাল নির্মাণ, মালবাহী ট্রেন চালুর জন্য পরিকল্পিত সময়সীমা নির্ধারণ ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি চুক্তি বাস্তবায়ন। নইলে ট্রেনের সম্ভাব্য আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা সড়কে থাকা খরচ-ব্যাহতিতে আটকে থাকতে হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১। কবে থেকে কক্সবাজারে ট্রেন চালু হয়েছিল?
উত্তরঃ দোহাজারি–কক্সবাজার রুটের যাত্রীবাহী সার্ভিস শুরু হয় ২০২৩ সালের শেষভাগে (ডিসেম্বর ২০২৩)।
প্রশ্ন ২। কার্গো সার্ভিস না শুরু হওয়ার মূল কারণ কী?
উত্তরঃ অপারেশনাল প্রস্তুতি (টার্মিনাল, ভ্যাগন ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক), অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব—এসব মিশ্র কারণ আছে।
প্রশ্ন ৩। রেল চালু হলে কী সুবিধা পাওয়া যেত?
উত্তরঃ পণ্যমূল্য হ্রাস, সড়কে যানজট-কমে, পরিবহন-দুরর্ঘটনা কমে, মাছ-লবণ-কৃষিপণ্যের কার্যকর প্রাপ্যতা বাড়ে।
আরো পড়ুনঃ
২৪ ঘণ্টা সাপোর্ট আর পার্সোনালাইজড সার্ভিস—AI দিয়ে বদলাচ্ছে কাস্টমার কেয়ার
AI এবং ভবিষ্যতের চাকরি- কোন কাজগুলো ঝুঁকিতে, কোনগুলো নিরাপদ?
তথ্যসূত্র
- The Business Standard — “Twenty months on, no freight service on Cox’s Bazar rail route”.





