spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

কেন বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম আবার বাড়ছে?

লেখকঃ মুসাররাত খান 

বর্তমান যুগে ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমাদের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা আমরা সবাই জানি। ল্যাপটপ, স্মার্ট ফোন থেকে শুরু করে টেলিভিশন, ফ্রিজ বা এয়ারকন্ডিশনার ইত্যাদি হোম অ্যাপ্লায়েন্স- সবকিছুতেই প্রযুক্তির ছোঁয়া। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম আবার বেড়ে যাচ্ছে, যা ভোক্তাদের জন্য বড় ধরনের চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন এই ইলেকট্রনিক্স পণ্যে দাম বাড়ছে? এর পিছনে কি কারণ? এবং সমাধান কি হতে পারে? চলুন জেনে নেই-

যেসব কারণে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম বেড়েই চলছেঃ

১. বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামাঃ বাংলাদেশের অধিকাংশ ইলেকট্রনিক পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ডলারের মান টাকার থেকে কমে গেলে আমদানি খরচ বেড়ে যায়। যা সরাসরি ইলেকট্রনিক্স বাজারের দামে প্রভাব ফেলে।

২. পরিবহন খরচে জ্বালানি সংকটঃ জাহাজ ভাড়া, শিপিং ও লজিস্টিক খরচ বেশি হওয়ার কারণে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে পণ্য আমদানি ব্যয় বেশি হয়ে যাচ্ছে।

৩. কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধিঃ বিশ্ববাজারে চিপসেট, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর ইত্যাদির দাম বাড়ছে। বিশেষ করে চিপ সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ছে যা ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দামের বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে।

৪. কর ও শুল্কের চাপঃ পণ্যের উপর অতিরিক্ত ভ্যাট ও কর যুক্ত হওয়ার কারণে স্মার্ট ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে।

আরোও পড়ুনঃ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ব্যবসায় — চ্যালেঞ্জ নাকি নতুন সুযোগ? 

বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিতে পণ্যের দাম বৃদ্ধির শতাংশঃ

কোম্পানি ও পণ্যের ধরন, দাম কত শতাংশ বেড়েছে এবং দাম বৃদ্ধির কারণ দেওয়া হলো-

কোম্পানিপণ্যের ধরনদাম বৃদ্ধির হার (%)দামের বৃদ্ধির কারণ

Samsung
স্মার্টফোন12–15%ডলারের দাম বৃদ্ধি, আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি
LED TV10–14%পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া
ফ্রিজ8–10%জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি, সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়া

Walton
স্মার্টফোন14–16%কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, ডলার রেট বৃদ্ধি
ল্যাপটপ12–15%চিপ সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি
ফ্রিজ10–12%জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি
LGLED TV13–14%বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, শিপিং খরচ বৃদ্ধি
ফ্রিজ9–10%ডলার সংকট, শুল্ক বৃদ্ধি
Xiaomiস্মার্টফোন15%ডলার রেট বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি
HPল্যাপটপ30–35%চিপ সংকট, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন সমস্যা
SonyLED TV12–13%আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি

বাস্তব প্রভাবঃ বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম কতটা বেড়েছে?

এদেশের জনপ্রিয় স্মার্টফোন ব্র্যান্ডগুলোর দাম গড়ে ১২-১৬% (Xiaomi ও Walton)বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে ল্যাপটপের ক্ষেত্রে ৩০-৩৫% পর্যন্ত দাম বেড়েছে। টিভি, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার সহ হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস-এর দাম বেড়েছে ৮-১৪%।

আরোও পড়ুনঃ প্রযুক্তি কীভাবে গড়ে তুলছে গ্রামীণ বাংলাদেশে নতুন উদ্যোক্তা? 

চ্যালেঞ্জঃ

দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং অনেকেই কেনাকাটা পিছিয়ে দিচ্ছে। দাম বেশি হওয়ায় দৈনন্দিন অনলাইন ও অফলাইন সেল কমে যাচ্ছে। গ্রাহকরা বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যেমন সস্তা ব্র্যান্ড বা সেকেন্ড হ্যান্ড পণ্য বেছে নিচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলারের মান অস্থিতিশীল থাকায় বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। কাঁচামাল, শিপিং খরচ এবং শুল্ক বৃদ্ধির ফলে উৎপাদনকারীদের চাপও বাড়ছে।

সমাধানের উপায়ঃ

১. লোকাল প্রোডাকশন বাড়ানোঃ স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন বাড়লে আমদানি নির্ভরতা কমবে। 

২. সরকারি ট্যাক্স ও শুল্ক কমানোঃ আমদানিকৃত ইলেকট্রনিক্স এ অতিরিক্ত ট্যাক্স এবং শুল্ক হ্রাস করলে দাম কমানো সম্ভব হবে।

৩. ডলার নির্ভরতা কমানোঃ বৈদেশিক মুদ্রার উপর নির্ভরতা কমাতে পারলে এবং বিকল্প সাপ্লাই চেইন তৈরি করলে দাম কমানো সম্ভব হতে পারে।

৪. কিস্তি সুবিধাঃ EMI, কিস্তি এসব মডেল চালু করলে গ্রাহকরা সহজেই পণ্য কিনে তা ভোগ করতে পারবে।

৫. টেকসই প্রোডাক্টঃ গ্রাহকরা দীর্ঘস্থায়ী পণ্যের দিকে বেশি আকৃষ্ট। তাই টেকসই প্রোডাক্ট তৈরি করার প্রবণতা বাড়াতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম বৃদ্ধির সবথেকে বড় কারণ গুলো হলো বৈদেশি মুদ্রার ওঠানামা, কাঁচামালের সংকট এবং কর নীতি ব্যবস্থা। দাম বৃদ্ধির হার পণ্যের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হলেও এ প্রভাব সব শ্রেণীর বক্তাদের ওপর পড়ছে। এই পরিস্থিতি সাময়িক হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে ও সাপ্লাই চেইন উন্নত করে দাম স্থিতিশীল করা সম্ভব।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তরঃ

১. হোম অ্যাপ্লায়েন্স কি? 

উত্তরঃ হোম অ্যাপ্লায়েন্স হলো সেইসব যন্ত্রপাতি যা সাধারনত ঘরোয়া কাজে ব্যবহৃত হয়, যেমন রান্নার, পরিষ্কার করা, খাবার সংরক্ষণ করা ইত্যাদি।

২. চিপসেট কি?

উত্তরঃ একটি চিপসেট হল ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটের একটি সেট যা কম্পিউটারের প্রসেসর, মেমোরি এবং অন্যান্য উপাদানগুলির মধ্যে ডেটা প্রবাহ পরিচালনা করার জন্য একসাথে কাজ করে ।

৩. EMI কি?

উত্তরঃ EMI এর অর্থ হলো “সমান মাসিক কিস্তি” (Equated Monthly Installment)।

৪. দীর্ঘ স্থায়ী ইলেকট্রনিক্স পণ্য ব্যবহার করলে কি লাভ হয়? 

উত্তরঃ প্রায় নতুন পণ্য কেনার প্রয়োজন হয় না ফলে খরচ কমে যায়।

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest article

কারখানা পুনরায় চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা

ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু, রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আনা এবং বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য...

আইএফআইসি ব্যাংক ও ল্যাবএইড গ্রুপের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

ঢাকা, ২০ মে ২০২৬ — দ্য ডেইলি কর্পোরেট ডেস্ক গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা নিশ্চিত করতে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি এবং দেশের অন্যতম...

ব্যস্ত না, কার্যকর হোন, উদ্যোক্তাদের সময় ব্যবস্থাপনা

লিখেছেনঃ মালিহা মেহেজাবিন বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক বিশ্বে একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু মূলধন, মানবসম্পদ বা প্রযুক্তি নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো সময়। অর্থ...

ব্যবসায় ব্যর্থতার প্রধান কারণগুলো কী?

লেখকঃ আরেফিন রানা পিয়াস বর্তমান সময়ে ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ নতুন ব্যবসা শুরু করলেও বাস্তবে...