লেখকঃ মুসাররাত খান
বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স দ্রুত গ্রাহকের হিসাবে পৌঁছাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকের কার্যদিবসে প্রাপ্ত ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স অবশ্যই একই দিনে অথবা সর্বোচ্চ পরবর্তী কর্মদিবসের মধ্যে গ্রাহকের হিসাবে জমা করতে হবে।
বুধবার (৮ জানুয়ারি) জারি করা এই সার্কুলার তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোকে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত একটি রূপান্তরকাল (Transition Period) দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রযুক্তি, প্রক্রিয়া ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রেমিট্যান্স গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই গ্রাহককে অবহিত করতে হবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সের মেসেজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রাহককে নিরাপদ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে (এসএমএস/অ্যাপ/ইমেইল) অবহিত করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী ও তাদের পরিবারের একটি প্রধান অভিযোগ ছিল; রেমিট্যান্স পাঠানো হলেও হিসাবে জমা পেতে দেরি হয়। নতুন নির্দেশনা কার্যকর হলে এই সমস্যার বড় অংশই সমাধান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে-
- ব্যাংকিং সময়ের মধ্যে পাওয়া রেমিট্যান্স একই কর্মদিবসে,
- ব্যাংকিং সময় শেষ হওয়ার পর পাওয়া রেমিট্যান্স পরবর্তী কর্মদিবসে গ্রাহকের হিসাবে জমা দিতে হবে।
আরোও পড়ুনঃ ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির কর্পোরেট ও কমার্শিয়াল ব্যাংকিংয়ের নেতৃত্বে আসিফ বিন ইদ্রিস
প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ
রেমিট্যান্স নিষ্পত্তির গতি বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে স্ট্রেইট-থ্রু প্রসেসিং (STP) অথবা ঝুঁকিভিত্তিক দ্রুত নিষ্পত্তি পদ্ধতি ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রয়োজনীয় তথ্য হাতে থাকলে কিছু নথি বা কমপ্লায়েন্স যাচাই পরবর্তী সময়ে সম্পন্ন করেও গ্রাহকের হিসাবে অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে করে গ্রাহক সেবার গতি বাড়বে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বিলম্ব কমবে।
তবে যেসব ক্ষেত্রে পোস্ট-ক্রেডিট রিভিউ সম্ভব নয়, সেখানে ব্যাংকগুলোকে প্রি-ক্রেডিট ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ তিন কার্যদিবসের মধ্যে রেমিট্যান্স নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নস্ত্রো হিসাব ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন
নতুন নির্দেশনায় রেমিট্যান্স নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে এন্ড-অব-ডে নস্ত্রো অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্টের ওপর নির্ভরতা কমাতে বলেছে।
এর পরিবর্তে ইন্ট্রা-ডে ক্রেডিট কনফার্মেশন ব্যবহার করে লেনদেন নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে দিনের মধ্যেই রেমিট্যান্স ক্রেডিট নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে রিকনসিলিয়েশন বা মিল যাচাই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাধারণভাবে রিকনসিলিয়েশন ইন্টারভ্যাল ৬০ মিনিটের বেশি না রাখার কথা বলা হয়েছে, যাতে ভুল, বিলম্ব বা অনিষ্পন্ন লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
আরোও পড়ুনঃ দুই দিনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন আমানত ৪৪ কোটি টাকা
স্বচ্ছতা বাড়াতে ইউইটিআর বাধ্যতামূলক
রেমিট্যান্স প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইউনিক এন্ড-টু-এন্ড ট্রানজ্যাকশন রেফারেন্স (UETR) ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো থেকে শুরু করে গ্রাহকের হিসাবে জমা হওয়া পর্যন্ত পুরো পথ সহজে অনুসরণ করা যাবে।
এ ছাড়া ডিজিটাল বৈদেশিক মুদ্রা প্ল্যাটফর্ম আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ভবিষ্যতে ‘ফর্ম সি’ ও ‘ফর্ম সি (আইসিটি)’ ধীরে ধীরে বাতিলের পথ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজারের প্রতিক্রিয়া ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ব্যবসায়িক মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রবাসী আয় ব্যবস্থাপনায় গ্রাহকের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রক্রিয়া আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
তবে কিছু ব্যাংকার মনে করছেন, রূপান্তরকালীন সময়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যাংকগুলোর জন্য সিস্টেম আপগ্রেড ও অটোমেশন একটি বড় বিনিয়োগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, দ্রুত ও স্বচ্ছ রেমিট্যান্স নিষ্পত্তি শুধু গ্রাহক সন্তুষ্টিই বাড়াবে না বরং আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রবাসী আয় প্রবাহ উৎসাহিত করবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতেও সহায়ক হবে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তরঃ
১. নতুন নির্দেশনায় রেমিট্যান্স জমার সময়সীমা কত?
উত্তরঃ ব্যাংকিং সময়ের মধ্যে পাওয়া রেমিট্যান্স একই দিনে এবং সময়ের বাইরে পাওয়া রেমিট্যান্স পরবর্তী কর্মদিবসে জমা দিতে হবে।
২. এই নির্দেশনা কবে থেকে কার্যকর?
উত্তরঃ ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে, তবে পূর্ণ বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত।
৩. সব নথি না থাকলেও কি রেমিট্যান্স জমা দেওয়া যাবে?
উত্তরঃ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকলে কিছু যাচাই পরবর্তী সময়ে সম্পন্ন করে অর্থ জমা দেওয়া যাবে।
৪. UETR ব্যবহারের উদ্দেশ্য কী?
উত্তরঃ রেমিট্যান্স লেনদেনের পুরো পথ ট্র্যাক করা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
৫. এতে প্রবাসী আয় প্রবাহে কী প্রভাব পড়বে?
উত্তরঃ দ্রুত জমার কারণে প্রবাসী ও প্রাপকদের আস্থা বাড়বে এবং আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।
তথ্যসূত্রঃ



