spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

AI ট্রাফিক, নতুন বাস টার্মিনাল, সবুজায়ন, ঢাকা দক্ষিণে ১,৯০৪ কোটি টাকার নতুন পরিকল্পনা

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ২৬ আগস্ট ২০২৬: শুধু রাস্তা নির্মাণ বা সংস্কার নয়—প্রযুক্তি, গণপরিবহন, পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধাকে একসঙ্গে সামনে রেখে রাজধানীর দক্ষিণ অংশকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে ১,৯০৪.৪২ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্য দিয়ে ‘স্মার্ট ও গ্রিন ঢাকা’ গড়ার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগোচ্ছে সংস্থাটি।

এবারের পরিকল্পনার বিশেষত্ব হলো, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আন্তঃজেলা বাস চলাচলের পুনর্বিন্যাস, সবুজায়ন এবং নাগরিক বিনোদনকেন্দ্রিক প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, নগর উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি কেবল সড়ককেন্দ্রিক না রেখে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

রাস্তা থাকবে, তবে পরিকল্পনার কেন্দ্র বদলাচ্ছে

চলতি অর্থবছরে ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো উন্নয়নে ৮০৬.৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫২৬.৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে সড়ক ও মহাসড়ক খাতে।

সড়ক উন্নয়ন, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নাগরিকদের চলাচল আরও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এবারের পরিকল্পনায় সড়ককে শুধু নির্মাণের বিষয় হিসেবে না দেখে এর সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিবহনকে সমন্বয় করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

২২ মোড়ে এআই—ঢাকার যানজট ব্যবস্থাপনায় নতুন পরীক্ষা

ডিএসসিসি এলাকার ২২টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এআইভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কারিগরি সহায়তায় এই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মূল লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থির সিগন্যাল ব্যবস্থার পরিবর্তে যানবাহনের চাপ ও চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা।

ডিএসসিসি প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম মনে করেন, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন আর বিলাসিতা নয়। যানবাহনের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে সিগন্যাল পরিচালনা করা গেলে যানজট কমানোর পাশাপাশি নগরবাসীর সময়ও সাশ্রয় হতে পারে।

তবে প্রকল্পটির বাস্তব সুফল অনেকাংশে নির্ভর করবে সঠিক ডেটা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অন্যান্য অংশের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।

সায়েদাবাদ থেকে কাঁচপুর—বাস চলাচলের চাপ কমানোর পরিকল্পনা

ঢাকার যানজটের অন্যতম বড় কারণ আন্তঃজেলা বাসের নগরকেন্দ্রিক চলাচল। এই চাপ কমাতে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

এ লক্ষ্যে কাঁচপুর টার্মিনালের প্ল্যাটফর্ম, শেড, টিকিট কাউন্টার ও শৌচাগারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দূরপাল্লার বাসের একটি বড় অংশকে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকার ভেতর দিয়ে চলাচল করতে হবে না। ফলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় সড়কগুলোর ওপর যানবাহনের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে শুধু টার্মিনাল স্থানান্তর করলেই যানজটের সমাধান হবে না। ফিডার পরিবহন, গণপরিবহনের সংযোগ, যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থাপনা এবং কাঁচপুরের সড়ক সক্ষমতা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন হবে।

ধানমন্ডি লেকে ৪৫ কোটি, সবুজায়নে আরও ৭ কোটি

ঢাকা দক্ষিণের পরিকল্পনায় এবার পরিবেশ ও নাগরিক বিনোদনও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে।

ধানমন্ডি লেকের অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। লক্ষ্য শুধু লেকটিকে নান্দনিক করা নয়, বরং এটিকে আরও নাগরিকবান্ধব করার পাশাপাশি এর পরিবেশগত ভারসাম্য ধরে রাখা।

অন্যদিকে নগর সবুজায়নে ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

‘জিরো সয়েল’ কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন সড়কের মিডিয়ানে গাছ ও ঘাস লাগানো হয়েছে। পাশাপাশি ডিএসসিসি নিজস্ব নার্সারি গড়ে তুলে ভবিষ্যতের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় চারা উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে।

ওসমানী উদ্যানে স্থাপিত নার্সারিতে ইতোমধ্যে প্রায় ১,৪০০টি চারা সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী বছর সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। নগর ভবনের দক্ষিণ পাশেও আরেকটি নার্সারি স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।

বড় প্রকল্পের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তবায়ন

২০২৬-২৭ অর্থবছরে ডিএসসিসির উন্নয়ন বরাদ্দ আগের অর্থবছরের মূল বরাদ্দের তুলনায় কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে মূল বরাদ্দ ছিল ২,১৯৬.৪০ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে কমে ১,৭০৭.৪১ কোটি টাকা হয়।

তাই এবারের পরিকল্পনার গুরুত্ব শুধু মোট বরাদ্দের অঙ্কে নয়; বরং কোন খাতে অর্থ যাচ্ছে এবং সেই অর্থ থেকে নগরবাসী কী ধরনের বাস্তব পরিবর্তন পাচ্ছে, সেটিই হবে মূল বিষয়।

এআই ট্রাফিক সিগন্যাল, কাঁচপুর বাস টার্মিনাল, ধানমন্ডি লেক এবং নগর সবুজায়নের মতো প্রকল্পগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকা দক্ষিণের নগর ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন মডেলের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

তবে এর জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং নাগরিক অংশগ্রহণও জরুরি।

কারণ একটি শহরকে ‘স্মার্ট’ করা শুধু প্রযুক্তি স্থাপনের বিষয় নয়। একইভাবে ‘সবুজ’ শহর তৈরি শুধু গাছ লাগানোর মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ কীভাবে চলাচল করছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে, কতটা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাচ্ছে এবং নগরসেবা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে—এসবের সমন্বিত উন্নয়নই শেষ পর্যন্ত স্মার্ট ও বাসযোগ্য শহরের মানদণ্ড তৈরি করবে।

ডিএসসিসির এবারের পরিকল্পনায় অন্তত সেই সমন্বিত পরিবর্তনের দিকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

কোরিয়া ভিসা আবেদন আরও সহজ করতে ঢাকায় চালু হচ্ছে নতুন কেন্দ্র

সাধারণ ভিসার আবেদন ও পাসপোর্ট সংগ্রহের কার্যক্রম নতুন কেন্দ্রে স্থানান্তরিত হবে, অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাধ্যতামূলক ঢাকা: বাংলাদেশে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কার্যকর করতে আগামী...

বাংলাদেশে আসছে পেপ্যাল? কতটা এগোল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উদ্যোগ

দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্কঢাকা, ২৩ আগস্ট ২০২৬: বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম PayPal-এর কার্যক্রম শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।...

৫১ হাজারের বেশি তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণে ৬৮৩ কোটি টাকার প্রকল্প সরকারের

দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্কঢাকা, ২৩ আগস্ট ২০২৬: দেশের বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের ফ্রিল্যান্সিংয়ে দক্ষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে ৬৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প...

৪০০ কোটি টাকার ‘ফান্ড অব ফান্ডস’: বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের স্টার্টআপ অর্থায়নের চিত্র

দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্কঢাকা, ১৮ আগস্ট ২০২৬: বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং বিদেশি মূলধন আকর্ষণের লক্ষ্য...