লেখকঃ নাওমী ইসলাম
২০২৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এখন থেকে পাসপোর্ট পেতে আর পুলিশের ভেরিফিকেশন লাগছে না। নতুন এই নীতিগত রদবদল দেশের ব্যবসায়, উচ্চশিক্ষা, বিদেশগামী কর্মী, প্রবাসী কিংবা ব্যক্তিগত দর্শনার্থী—সবার জন্যই সুবিশাল সুযোগের দুয়োর খুলে দিয়েছে। এরই ফলে দ্রুত, কম খরচে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট পাওয়া সহজ হবে, যা দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
পরিবর্তনের কারণ ও পটভূমি
লম্বা সময় ধরে পাসপোর্টে পুলিশের ভেরিফিকেশন ছিল দুর্নীতি, হয়রানি ও অকারণ দীর্ঘসূত্রিতার কেন্দ্রে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর গবেষণায় দেখা যায়, ৭৫.১% আবেদনকারী পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়া এ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ও একাধিকবার একই তথ্য যাচাই জাতীয় সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি বাড়াতো, তাতে সরকারি সেবা সম্পর্কে মানুষের আস্থা হ্রাস পেত।
২০১৭ সালেই TIB-এর সুপারিশ ছিল, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের মতো আধুনিক ও ডিজিটাল উপায়ে নাগরিক যাচাই-প্রক্রিয়া চালু করা। ২০২৫ সালে অবশেষে সরকারি গেজেট ও মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে সেই অনুরোধ বাস্তবায়ন হয়েছে।
নতুন ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়া (২০২৫)
১. নো পুলিশ ভেরিফিকেশন: জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)—প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (BRC)—কিশোরদের জন্য, এবং বিদেশে অবস্থানরতদের ক্ষেত্রেও BRC-এর ভিত্তিতে পাসপোর্ট দেয়া হবে। কোনো কাগজপত্র সত্যায়নের দরকার নেই।
২. অনলাইন আবেদন: আবেদন ফরম নিজেদের বাড়িতে বসে অনলাইনেই পূরণ, ফি অনলাইনে পরিশোধ, নির্ধারিত দিনে বায়োমেট্রিক তথ্য জমা—সবই ডিজিটাল হাবে হচ্ছে।
৩. নথিপত্র: পূর্ণাঙ্গ এনআইডি, জন্মনিবন্ধন সনদ (১৮ বছরের নিচে), ব্যক্তিগত তথ্য, পূর্বের পাসপোর্ট থাকলে সেটি; শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও প্রবাসীদের কোনো বিশেষ হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে না—তাদের জন্যও আবেদন সহজ।
ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বিদেশগামী শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের জন্য আশীর্বাদ: দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ইউরোপে চাকরি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে।
বাজার সম্প্রসারণ ও FDI আনার সুযোগ: বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজ নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছ নাগরিক যাচাইয়ের কারণে বাংলাদেশকে ব্যবসার জন্য আরও আকর্ষণীয় মনে করবেন।
উন্নত দেশীয়-কর্মসংস্থান: উদ্যোক্তা, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি, আমদানিকারক-রপ্তানিকারকদের বিদেশে পণ্য প্রচার, ট্রেড ফেয়ার, প্রেজেন্টেশন করতে আর কোনো প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয় না।
উন্নত ব্র্যান্ড ইমেজ, রাষ্ট্রের আস্থাহৃদয়: দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশর ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্তিশালী হবে, দেশি-বিদেশি প্রভাব বাড়বে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ লক্ষণ
নকল পরিচয়ে অপব্যবহারের ঝুঁকি: পাসপোর্টে সরাসরি পুলিশ চেক বাদ পড়ায়, অসাধু কিছু চক্র ভুল তথ্য বা নকল পরিচয়ে পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ নিতে পারে—এ বিষয়ে ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার ও ক্রস-চেকিং সুরক্ষা জরুরি।
প্রযুক্তি নির্ভরতা: অনলাইন সিস্টেমের নিরাপত্তা, দ্রুত তথ্য আপডেট এবং নাগরিক ডেটাবেইসের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এখন করণীয়।
উপসংহার
আধুনিক বাংলাদেশে পাসপোর্টে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাতিলের সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী। চাকরি, উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা কিংবা প্রবলেম-ফ্রি ভ্রমণের জন্য এটা সুযোগের নতুন দ্বার খুলেছে। শিগগিরই দেশের উন্নয়ন সূচকে এই সিদ্ধান্ত ফেলবে বড় প্রভাব। দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রিতা ও হয়রানিমুক্ত দ্রুত সেবা—এটাই আধুনিক বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজ।
কিছু প্রশ্ন ও উত্তর
১. এখন কি পাসপোর্ট পেতে পুলিশ ভেরিফিকেশন লাগে?
না। ২০২৫ সালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পাসপোর্ট পেতে আর পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রয়োজন নেই। আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্মনিবন্ধন (BRC) যথেষ্ট।
২. পাসপোর্ট আবেদনে কি চুক্তি বা পুলিশ অফিসে যেতে হবে?
না। এখন অনলাইন আবেদন, ফি পরিশোধ, এবং নির্দিষ্ট কেন্দ্রে বায়োমেট্রিক জমাইতেই সব হয়ে যাবে।
৩. এই নতুন নিয়মে কি কোনো ঝুঁকি আছে?
ডিজিটাল বৈধতা আর ফাঁকফোকর বন্ধে সরকারের নজরদারি আরও জোরদার করা দরকার, যেন ভুয়া পরিচয়ে কেউ সুবিধা না নিতে পারে।
৪. আগের ঘুষ, দালাল কিংবা দেরির অভিজ্ঞতা কি এখনো থাকবে?
না, এখন ডিজিটাল এবং স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট দ্রুত পাওয়া যাবে। ঘুষ আর দালালের সুযোগ নেই বললেই চলে।
৫. এই সুবিধা থেকে কি প্রবাসীরাও উপকৃত হবেন?
হ্যাঁ, প্রবাসী বাংলাদেশিরা ও বিদেশে বসেই অনলাইনে আবেদন করে সহজে পাসপোর্ট পাবেন।



