দ্য ডেইলি করপোরেট ডেস্ক
ঢাকা, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: দেশের ব্যাংকিং খাতে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা তিন মাসে ৫ হাজার ৭৭টি বেড়েছে। একই সময়ে এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যাংক হিসাবের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজারে। এসব হিসাবে জমা ছিল ৮ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। মার্চ শেষে এ ধরনের হিসাবগুলোতে জমার পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
তবে ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বাড়াকে সরাসরি দেশে ধনী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার নির্দেশক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ এই শ্রেণির হিসাবের বড় অংশই ব্যক্তি নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের।
ব্যক্তি হিসাবের অংশ তুলনামূলক কম
ব্যাংকারদের অনুমান, ১ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত, আর বাকি বড় অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার।
তাই এসব হিসাবের সংখ্যা বাড়ার অর্থ এই নয় যে সমান হারে নতুন কোটিপতি তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে প্রতিবছরই আমানতের পরিমাণ বাড়ে এবং সে কারণে বড় অঙ্কের আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যাও স্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও বলেছেন, হিসাবের ধরন ও মালিকানা বিবেচনা না করে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দিয়ে দেশে কোটিপতির সংখ্যা নির্ধারণের সুযোগ নেই।
মোট ব্যাংক আমানতের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কম
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে জমা অর্থের প্রবৃদ্ধি পুরো ব্যাংকিং খাতের আমানত বৃদ্ধির তুলনায় কম।
জুনে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোর জমা বেড়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এই শ্রেণির আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ।
অর্থাৎ বড় অঙ্কের আমানত বাড়লেও সামগ্রিক ব্যাংক আমানত বৃদ্ধির তুলনায় এর গতি এখনো কম।
ব্যাংকে বড় অঙ্কের অর্থ রাখায় অনাগ্রহ কেন?
ব্যাংকারদের মতে, দেশে যাদের হাতে উল্লেখযোগ্য সম্পদ রয়েছে, তাদের সবাই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংকে নগদ হিসেবে রাখেন না। অনেকেই জমি, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দেন।
এ ছাড়া কর, ভ্যাট এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির আশঙ্কা থেকেও কেউ কেউ ব্যাংকে বড় অঙ্কের অর্থ রাখতে অনাগ্রহী হতে পারেন। অনেক আমানতকারী আবার একটি হিসাবে বড় অঙ্কের টাকা না রেখে একাধিক হিসাবে অর্থ ভাগ করে রাখেন।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক সংকটও বড় আমানতকারীদের একটি অংশকে ব্যাংকে অর্থ রাখার বিষয়ে সতর্ক করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের সম্পদের চিত্র কি ব্যাংক হিসাবে দেখা যাচ্ছে?
মেঘনা ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় অতি ধনী ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থের পরিমাণ খুবই কম।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বর্তমানে প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার হলেও দেশের সম্পদ বৈষম্যের যে চিত্র রয়েছে, ব্যাংক হিসাবের তথ্য তা পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, ২৫ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব মাত্র ১২০টি। এ সংখ্যা দেশের সামগ্রিক সম্পদ বণ্টনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও প্রশ্ন তৈরি করে।
তার ব্যাখ্যা, এর একটি কারণ হতে পারে ধনী ব্যক্তিরা ব্যাংকে বড় অঙ্কের অর্থ রাখছেন না। আবার কেউ কেউ একটি ব্যাংক হিসাবে বড় পরিমাণ অর্থ রাখতে স্বস্তিবোধ না-ও করতে পারেন।
কোটি টাকার বেশি আমানতের হিসাব ওঠানামা করে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, এই ধরনের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ও আমানতের পরিমাণ সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করে।
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার এবং এসব হিসাবে জমা ছিল ৮ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের জুন শেষে এমন হিসাব ছিল প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার, যেখানে জমা ছিল ৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ শুধু হিসাবের সংখ্যা বাড়লেই এসব হিসাবে জমা মোট অর্থও একই হারে বাড়বে—এমন কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
বাড়তে পারে সম্পদ বৈষম্যের প্রশ্ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান মনে করেন, বৈধ আয়, বেতন-ভাতা, ব্যবসায়িক আয় এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোনো ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি টাকা জমা হওয়াকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখার কারণ নেই।
তবে কারও আয়-ব্যয়ের সঙ্গে তার ব্যাংক হিসাবে অর্থের দ্রুত বৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তার মতে, কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা বাড়ার আরেকটি দিক হলো সম্পদ বৈষম্য। অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়া কোনো অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।
কর ও ভ্যাটের ভয়েও ব্যাংকের বাইরে অর্থ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, কর ও ভ্যাট-সংক্রান্ত জটিলতার আশঙ্কায় অনেক মানুষ ব্যাংকে অর্থ রাখার বিষয়ে নিরুৎসাহিত হন।
কেউ কেউ কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকতে চান। আবার বৈধ অর্থ থাকা সত্ত্বেও আইনি জটিলতা বা হয়রানির আশঙ্কায় অনেকে ব্যাংকে বড় অঙ্কের টাকা রাখতে স্বস্তি বোধ করেন না।
তার মতে, অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করতে হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঘিরে থাকা ভয় ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি কমাতে হবে।
একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের নামে যেন বৈধ অর্থের মালিকরাও অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
কোটি টাকার হিসাব বাড়ছে, কিন্তু গল্পটা শুধু কোটিপতির নয়
ব্যাংকে ১ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা তিন মাসে ৫ হাজারের বেশি বাড়লেও এটিকে দেশে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কারণ এই হিসাবগুলোর বড় অংশই প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। একই সঙ্গে দেশে ধনী ব্যক্তিদের একটি অংশ ব্যাংকের বাইরে জমি, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ করেন বা একাধিক হিসাবে অর্থ ভাগ করে রাখেন।
তবে এই পরিসংখ্যান ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের অর্থের গতিপ্রকৃতি, সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং মানুষের ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর আস্থার বিষয়টি নতুন করে সামনে আনছে। ব্যাংকে কত টাকা আছে তার পাশাপাশি কেন মানুষ সেই টাকা ব্যাংকে রাখছে বা রাখছে না—অর্থনীতির জন্য সেই প্রশ্নটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS)




